ফরজ গোসলের নিয়ম | গোসল ফরজ হওয়ার কারণ

ফরজ গোসলের নিয়ম সম্পর্কে নিচে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হবে। তাই আপনি যদি ফরজ গোসলের নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে রাখতে চান, তাহলে নিম্ন বর্ণিত তথ্য গুলো মনোযোগের সাথে পড়তে থাকুন। আসুন দেখে নেই, ফরজ গোসলের নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত।

উপস্থাপনা

নারী-পুরুষ উভয়ের উপরে বিভিন্ন কারণে গোসল ফরজ হয়। আর শরীয়তের দৃষ্টিতে ফরজ গোসল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই ফরজ গোসলের নিয়ম না জেনে গোসল করার কারণে কিংবা লজ্জায় অন্যের কাছে জিজ্ঞাসা করা সংকোচ মনে করার কারণে অনেক মুসলমান ভাই বোনের ফরজ গোসল শুদ্ধ হয় না।  যার ফলে নামাজ ও অন্যান্য আমল সমূহ কবুল হয় না। 

কোন ব্যক্তি যদি ফরজ গোসলের নিয়ম না মেনে সাগরের সমস্ত পানি দ্বারা ‌ও গোসল করে তার ফরজ গোসল সম্পূর্ণ হবে না। তাই ফরজ গোসলের নিয়ম মেনে শরীয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী ফরজ গোসল করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য জরুরী। ফরজ গোসলের নিয়ম জানার আগে আমাদের জানতে হবে কোন কোন কারণ গোসল ফরজ হয়।

গোসল ফরজ হওয়ার কারণ

গোসল ফরজ হওয়ার কারণ সমূহ সম্পর্কে যদি আপনি না জেনে রাখেন তাহলে কিন্তু অপবিত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা আপনি যখন গোসল ফরজ হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানবেন, কেবল তখনই গোসল ফরজ হলে গোসল করে নিতে পারবেন। 

পক্ষান্তরে যদি আপনি গোসল ফরজ হওয়ার কারণ সম্পর্কে না জেনে রাখেন, তাহলে কিন্তু গোসল ফরজ হলে গোসল নাও করতে পারেন। আর ফরজ গোসল তরক করার কারণে গুনাহগার হতে হবে। যাইহোক নিচে গোসল ফরজ হওয়ার কারণ সমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো। 


(১) মনি তথা বীর্য বের হওয়া হওয়া অর্থাৎ উত্তেজনার সাথে বীর্য তার স্বস্থান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে শরীরের বাইরে বের হওয়া। চাই তা জাগ্রত অবস্থায় বের হোক অথবা ঘুমন্ত অবস্থায়। বেহুশ অবস্থায় বের হোক অথবা হুশ অবস্থায়।

(২) সঙ্গম করা অর্থাৎ কোন বালেগ পুরুষের বিশেষ অঙ্গ কোন জীবিত নারীর বিশেষ অঙ্গে কিংবা কোন জীবিত মানুষের গুহ্য দ্বারে প্রবেশ করা। বীর্যপাত হোক বা না হোক, এমতাবস্থায় উভয়জন যদি প্রাপ্তবয়স্ক হয় তাহলে ভয়ের উপরে গোসল করা ফরজ।
(৩) হায়েজ অর্থাৎ ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হ‌ওয়া। অর্থাৎ নির্ধারিত ঋতুস্রাব যখন সমাপ্ত হবে তখন অবশ্যই গোসল করে নিতে হবে। সুতরাং ফরজ হওয়ার অন্যতম একটি কারণ হলো: ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হ‌ওয়া। 

(৪)নেফাস থেকে পবিত্র হ‌ওয়া। স্ত্রীলোকের সন্তান প্রসব হওয়ার পর জরায়ু থেকে যে রক্ত বের হয় তাকেই নেফাস বলে।

ফরজ গোসলের নিয়ম

আপনি যদি ফরজ গোসলের নিয়ম সম্পর্কে না জেনে রাখেন তাহলে কখনোই সঠিক নিয়মে গোসল করতে পারবেন না। তাই অবশ্যই আপনার উচিত হবে ফরজ গোসলের নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জেনে নেওয়া। নিচে ফরজ গোসলের নিয়ম ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো। 


(১) যে ব্যক্তি ফরজ গোসল করবে সে প্রথমে মনে মনে পবিত্রতা অর্জনের নিয়ত করবে এবং বিসমিল্লাহ বলে উভয় হাতের কব্জি পর্যন্ত ধৌত করবে।

(২) অতঃপর লজ্জাস্থান ধৌত করবে চাই লজ্জা স্থানে অপবিত্রতা লেগে থাকুক চাই না থাকুক।
(৩) শরীরে বা কাপড়ে নাপাকি লেগে থাকলে তা দূর করবে।

(৪) অজু করবে। যদি চৌকি বা পাথরের উপর বসে গোসল করে তাহলে অজু করার সময় পা সহ ধৌত করবে।আর যদি গোসলের জন্য এমন জায়গা হয়, যেখানে পানি জমে থাকে তাহলে গোসলের পর পা ধৌত করবে এবং ওযুর সময় পা ধৌত করবে না।

(৫) ওযুর পর তিনবার মাথায় পানি ঢালবে অথবা তিনবার তিনবার ডান কাধ ও বাম কাঁধে পানি ঢালবে।

(৬) সমস্ত শরীরে এমনভাবে পানি ঢালবে, যাতে প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পানি পৌঁছে,কোথাও শুকনা না থাকে। কেননা শরীরের চুল পরিমাণ জায়গা ও যদি শুকনা থাকে ফরজ গোসল শুদ্ধ হবে না।

গোসলের ফরজ  | গোসলের ফরজ কয়টি

ইতোমধ্যেই উপরে ফরজ গোসলের নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। আর্টিকেলটির এই অংশে গোসলের ফরজ কয়টি? তা তুলে ধরা হবে। গোসলের মধ্যে এমন কতগুলি কাজ আছে, যাহা না করলে ফরজ গোসল আদায় হবে না। আর এই কাজগুলোকেই বলা হয় গোসলের ফরজ। তাই গোসলের ফরজ আদায় না করলে আপনি কখনোই পবিত্র হতে পারবেন না। যাইহোক। গোসলের ফরজ মোট তিনটি। নিচে গোসলের ফরজ সমূহ তুলে ধরা হলো। 

(১) গড়গড়া করে কুলি করা।

(২) নাকের নরম জায়গা পর্যন্ত পানি পৌঁছানো।

(৩) সমস্ত শরীর ভালোভাবে ধৌত করা।

সমস্ত শরীরের একটি পশম পরিমাণ জায়গা যদি শুকনা থাকে গোসল হবে না। অনুরূপভাবে যদি কোন ব্যক্তি কুল্লি করতে ভুলে যায় কিংবা নাকে পানি দিতে ভুলে যায় তাহলেও ফরজ গোসল শুদ্ধ হবে না। যদি কোন ব্যক্তির গোসলের পরে মনে পড়ে যে, শরীরের অমুক জায়গা পানি পৌছেনি শুকনা রয়ে গেছে।এমতাবস্থায় দ্বিতীয় বার গোসল করার প্রয়োজন নেই। 
শুধু শুকনা জায়গাটুকু ধৌত করলেই গোসল হয়ে যাবে কিন্তু ভিজা হাত ফিরিয়ে নিলে হবে না বরং কিছু পানি নিয়ে ধুয়ে ফেলবে। আর যদি কুল্লি করতে ভুলে যায় কিংবা নাকে পানি দিতে ভুলে যায় তাহলে কুলি করবে অথবা নাকে পানি দিবে। মোট কথা যেটুকু জায়গা ভিজা থাকবে শুধু ওইটুকু জায়গা ধৌত করলেই চলবে দ্বিতীয়বার গোসল করার প্রয়োজন নেই।

মেয়েদের ফরজ গোসলের নিয়ম

যদি মহিলাদের মাথার চুল বেণী করা না হয়, তাহলে সমস্ত চুল ভেজানো এবং চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরজ। একটি চুল ও যদি শুকনা থাকে কিংবা একটি চুলের গোড়াতেও যদি পানি না পৌঁছে তাহলে গোসল হবে না।

আর যদি কোন মহিলার মাথার চুল বেনী গাথা থাকে তাহলে চুল ভেজানো মাফ(এই হুকুম শুধু মহিলাদের জন্য খাস, কোন পুরুষ যদি মাথায় লম্বা লম্বা চুল রাখে এবং চুল বেনী বাধা থাকে তাহলে তার জন্য মাফ নয় বরং বেণী খুলে সমস্ত চুল ভেজানো ফরজ) তবে সমস্ত চুলের গোড়ায় পানি পৌঁছানো ফরজ একটি চুলের গোড়াও যদি শুকনা থাকতে না পারে। কিন্তু যদি বেণী খোলা ব্যতীত সমস্ত চুলের গোড়া পানি না পৌঁছে তাহলে বেণী খুলবে এবং সমস্ত চুল ভিজাবে।

মহিলারা নথ, বালি, আংটি নাকের ফুল কানের দুল ইত্যাদি ভালোভাবে নাড়াচাড়া করে নাক ও কানের ছিদ্রে পানি পৌছাবে। যদি অলংকার পরিধান করে না থাকে তবুও সতর্কতার জন্য নাক ও কানের ছিদ্রে পানি পৌঁছাতে হবে।

কারো নখের ভেতর আটা, চুন ইত্যাদি লেগে শুকিয়ে যাওয়ার কারণে ভিতরে পানি প্রবেশ না করলে ওযু গোসল হবে না। তদ্রপ যদি কোন মহিলা  নখে নখ  পালিশ কিংবা আবরণ জাতীয় কোন বস্তু লাগানোর ফলে ভেতরে পানি প্রবেশ করতে না পারে,  কিংবা কারণ নখ এত বড় হয় যে, যার কারণে ভেতরে ময়লা জমে যায়, তাহলে নখ পালিশ ও আবরণ উঠিয়ে ফেলে এবং ময়লা পরিষ্কার করে ভেতরে পানি পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় ওযু -গোসল হবে না।

রোজা অবস্থায় ফরজ গোসলের নিয়ম

স্ত্রী সহবাস কিংবা স্বপ্নদোষের কারণে গোসলের প্রয়োজন হয় কিন্তু রোজা অবস্থায় ফরজ গোসল কিভাবে করব অনেকেই জানেনা। এবং এই বিষয় সম্পর্কে ফলে দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যায়। তাই এখানে রোজা অবস্থায় ফরজ গোসলের নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হবে। রমজান মাসে ফরজ গোসল উপরে উল্লেখিত নিয়মেই করতে হবে কিন্তু কুলি করার ক্ষেত্রে গড় গড়ার সহিত কুলি করা যাবে না। 
কেননা এর দ্বারা গলার ভেতরে পানি প্রবেশ করে রোজা ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা জরুরী। অনুরূপ নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত যাতে গলার ভেতর দিয়ে পানি পেটে প্রবেশ না করে।

শেষ কথা

আপনি যদি প্রথম থেকে এই আর্টিকেলটি পড়ে থাকেন তাহলে ফরজ গোসলের নিয়ম সম্পর্কে আশা করি বিস্তারিত তথ্য জানতে পেরেছেন। কেননা এই আর্টিকেলটিতে ফরজ গোসলের নিয়ম এবং গোসল ফরজ হওয়ার কারণ সমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। তথ্যবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এই আর্টিকেলটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে তাহলে সকলের সাথে শেয়ার করবেন। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url